প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমার পৃথিবী বলতে ছিল বাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এলাকা। এর বাইরে হঠাৎ হঠাৎ যে বন্ধুদের সাথে একটু দূরে যাওয়া হত না তা না; তবে সেটা খুবই কম। যতদূর মনে পড়ে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকে আমার পৃথিবী বিস্তৃত হতে শুরু করে। সেই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের সদস্যদের বাদ দিয়ে নিজে অথবা বন্ধুদের সাথে ঘুরা শুরু করলাম। অর্থাৎ পরিবারের কাউকে আর সঙ্গে নিব না। অফিস আদালতের কোন কাজ হলে পরিবারের কাউকে সাথে নিতাম। অন্য কোন ধরনের কাজে বন্ধুদের সাথে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম।  সেই থেকে আমার নিজের মত করে পথ চলা শুরু।

আমার ছোট্ট পৃথিবীটা যত বিস্তৃত হয়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলিও তত বিস্তৃত হওয়া শুরু করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বিস্তৃত বিষয়ে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা হতে থাকে, যা এখন পর্যন্ত চলছে।

চলার পথে চমৎকার কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন সদস্যদের সাথে। আমাদের পুলিশ যখন নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয় তখন খুব অবাক হই! মনে হয়, “আমি যে পুলিশদের চিনি তারাই কি এগুলো করছে?” এটা চিন্তা করে সত্যিই আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়।

আমাদের পুলিশের মাঝে বিবেক এখনো বেঁচে আছে। সেটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাসের কারণ আমার এই অভিজ্ঞতাগুলো।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে যখনই আমি রাস্তা পার হতে যাই তখনই কারো না কারো সহযোগীতার হাত আমার দিকে এগিয়ে আসে। বসে বসে চলি বলে মানুষ ভাবে হয়তো আমি পার হতে পারবো না। কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসের সাথেই সব সময় রাস্তা পার হই। আলহামদুলিল্লাহ এখনো কোন বিপদ সংঘটিত হয়নি। তবে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে আমি পুলিশের সহযোগীতা কখনো ফিরিয়ে দেই না। বেশীর ভাগ সময় তারা আমাকে রাস্তার ঐ পার পর্যন্ত দিয়ে আসে এমনকি রিকশা লাগবে কিনা বা কোথায় যাবো তা জিজ্ঞেস করতেও ছাড়ে না। যতবারই কোন পুলিশ আমাকে রাস্তা পার করে দেয় আমি বড় করে একটা “ধন্যবাদ” দিতে দ্বিধা করি না। একটু উচ্চ স্বরে “ধন্যবাদ ভাইজান” বলে তাদের কাছে হৃদয়ের কৃতজ্ঞতাটুকু পৌঁছে দেই।

খুব বেশীদিন হইনি আমি হুইলচেয়ার ব্যবহার করা শুরু করেছি। সত্যি বলতে কি কখনো চিন্তা করিনি এতটা নিয়মিত হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হবে। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আয়োজনে, মিটিং-সিটিং এ নিয়মতিই হুইলচেয়র নিয়ে যাই। যতবারই আমি রাস্তায় হুইলচেয়ার নিয়ে বের হয়েছি ততবারই আমি পুলিশের আন্তরিক সহযোগীতা পেয়েছি। সাথে সাথে থেকে, গাড়ি হাত দিয়ে আটকে তারা সুন্দর করে আমাকে পার করে দিয়েছে। এমনকি কয়েকজন পুলিশ একটু হুইলচেয়ার ঠেলে দিয়ে সহযেগীতা করতে ছাড়েনি।

চলাচলের জন্য রিকশাই আমার প্রধান বাহন। ঘড় থেকে দূরে কোথায় গেলে রিকশা লাগবেই। বহুল ব্যবহার করা হয় বলে রিকশা নিয়েই আমার ঝামেলা বেশী। কিছুদিন পর পর ভাড়া বাড়ার যন্ত্রণাতো আছেই, সাথে বাড়ির পথে রিকশা না পাওয়া। আমার এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলে রিকশা পেতে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় না। কিন্তু অন্য এলাকা থেকে আমার এলাকায় ফিরে আসার সময় রিকশা পাওয়াটা কখনোই যন্ত্রণা ভোগ ছাড়া হয়নি। আর সেই ফিরে আসার সময়টা যদি রাত আটটা কিংবা তার পরের সময় হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই। যন্ত্রণা তার ষোল কলা পূর্ণ রতে কুণ্ঠিত হবে না। বহুবার এমনও হয়েছে রাত আটটার দিকে রিকশা খোঁজা শুরু করেছি আর সেটা রাত দশটায় পেয়েছি।

এ ধরনের বিপদে বহুবার পুলিশের সহযোগীতা পেয়েছি কিংবা পুলিশের সহযোগীতায় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। তাদের অনেকেই জোর করে কোন একটা রিকশা চালককে ধরে এনে আমাকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়েছে। কারণ তারা আমার দীর্ঘ ক্ষন ধরে রিকশার পাবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে দেখছিল। এই ধরণের বেশীরভাগ সহযোগীতাই পেয়েছি নীলক্ষ্যত মোড় আর আজিমপুর মোড়ে। কারণ রিকশার জন্য এই দুই মোড়েই আমাকে সবচাইতে বেশী কষ্ট পোহাতে হয়েছে। জোর করে কোন রিকশা ধরিয়ে দিলে যদিও আমার বেশ বিব্রত লাগে কিন্তু উঠে পরি। এর পর রিকশা চালককে ন্যাজ্য ভাড়া দিয়ে খুশী করতে দ্বিধা করি না।

একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেবার আমি আর আমার বড় আপা গিয়েছিলাম ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’ দেখার জন্য। দেখা শেষ করে যখন ফিরে আসছি তখন ঘটনাটা ঘটে। ঘটনাটা আসলে আমার চোখে পড়েনি। রিকশায় উঠার পর বড় আপা ঘটনাটা বলাতে আমি জানতে পারি। আমরা যখন রিকশা ঠিক করছিলাম একজন পুলিশ অফিসার দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলেন রিকশা পেলমা কিনা। রিকশা পাবার পর আমি উঠতে পারলাম কিনা তা দেখার জন্য তিনি তার স্থান ছেড়ে এগিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটা শুনে সত্যিই খুব ভাল লেগেছিল।

মধ্য বিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে রিকশার পর সবচাইতে বেশী ব্যবহার করতে হয়েছে বাস। বাস যাত্রা সব সময়ই আমি উপভোগ করি। বিশেষ করে একটু দূর যাত্রা হলে খুব কম সময়ই আমি ক্লান্ত বোধ করি। ‘বাসস্ট্যান্ড’ না হলে বাসে উঠাটা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব। আবার যে সকল বাস না দাঁড়িয়ে দৌড়ের উপর চলে যায় সেগুলোতে উঠার কখনোই চেষ্টা করি না। সাথে কেউ থাকলে বাস দাঁড় করানোর জন্য চেষ্টা করে এবং বাস দাঁড়ালে উঠে পরি।

বাসে উঠার জন্য অনেক সময়ই আমি পুলিশের সহযোগীতা পাই। তাদের হাতের ইশারায় বাস চমৎকার ভাবে দাঁড়িয়ে যায় যেটা আমার জন্য বাসে উঠা সহজ করে দেয়। তবে মাঝে মাঝে এটা বিপদের কারণও হয়। বাসে উঠিয়ে দিয়ে বাসের হেলপারকে নির্দেশ দিয়ে দেয় আমার কাছ থেকে বাস ভাড়া না নিতে। আমি কখনোই বাস ভাড়া না দিয়ে যাত্রা করতে পছন্দ করি না। এটা আমাকে বিব্রত করে। তার পরও, সেই সকল পুলিশের সহযোগীতা আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি যারা আমাকে সহযোগীতা করে তাদের হৃদয়ের শুভ্রতাকে স্পষ্টই প্রকাশ করেছেন।

শেষ করছি একটা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা দিয়ে।

২০১৬ সালের মার্চ/এপ্রিলের দিকে গাবতলীর পর্বতের মোড়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্রাকের নিচে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম। আমি রাস্তা পার হবার সময় ভাল করে আশে পাশে দেখে নিয়ে তার পর রাস্তা পার হই। সেদিনও রাস্তা পার হবার আগে ডানে বায়ে দেখে নিয়ে পার হওয়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু ডানে দুই বাসের পেছন দিক থেকে আসা একটা ট্রাকের গতিকে সঠিক ভাবে মেপে উঠতে পারেনি। ফলে যা হবার তাই হল, আমি যখন রাস্তার মাঝ বড়াবড় তখন সেটা দুই বাসকে ওভার টেক করে রকেটের গতিতে আমার সামনে এসে হাজির। কি করবো বুঝতে না পেরে রাস্তা পার হওয়া অব্যহত রাখছিলাম। ভাগ্য ভাল, আল্লহ রব্বুল আলামীন আমানে বাঁচানোর জন্য দুই পুলিশকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা রাস্তার দুই পাশ থেকে দ্রুত দৌঁড়ে এসে ভয়ঙ্কর ভাবে এগিয়ে আসা সেই ট্রাককে আরো ভঙ্কর ভাবে থামিয়ে দেন এবং আমাকে রাস্তা পার করে দেন। সেদিন তাদের ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে আজকের এই ব্লগটি লেখা সম্ভব হচ্ছে।


বাংলাদেশ পুলিশের সাথে আমার অভিজ্ঞতা হাজারটা পার হয়ে গিয়েছে। মজার কিছু অভিজ্ঞতা আছে যেগুলো স্মৃতিচারনের ক্ষেত্রে চমৎকার। সব ঘটনা থেকে দুই একটা ঘটনা তুলে ধরলাম যাতে আমাদের মাঝে একটা প্রশ্নের উদ্বেক হয়-

পুলিশ কেন এমন এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে?

Advertisements