২০১৭ শুরু হয়ে গেল! কেন যেন মনে হয় ২০১৬ সালটা খুব দ্রুতই চলে গেল! যদিও জগতের নিয়মের সঠিক সূত্র পালন করেই বছরটা নিয়মতান্ত্রিক ভাবেই বিদায় নিয়েছে।

নানান কারনেই ২০১৬ আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। ২০১৬ সালে নিজের যোগ্যতাকে উর্ধ্বে তুলে ধরার যে ভিত্তি তৈরী করেছি সেই ভিত্তির উপর ২০১৭ সালে নিজের যোগ্যতার কাঠামো প্রস্তুত করতে নিজেই নিজেকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছি। নিজেই নিজের কাছে ওয়াদা করেছি ২০১৭ সালে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার।

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সেই শুরু থেকেই নানান চ্যালেঞ্জের মুকাবেলা করেই আমাকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। জীবনে কখনোই নিজেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চিন্তা করে মনক্ষুন্ন হইনি। কিন্তু শিক্ষা জীবন শেষ করে যখন কর্মজীবনের যুদ্ধে নামলাম তখন যেন সব বাধ ভেঙ্গে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম অতল গহ্বরে। কারণ প্রতিটি স্থানেই আমি নিজের প্রতিবন্ধিতার দরুণ দারুণ আঘাত পেয়েছি। প্রতিটি আঘাত আমাকে দুর্বল করেছে। প্রতিটি আঘাতের পর আমাকে নতুন করে দাঁড়াতে যুদ্ধ করতে হয়েছে।

২০১২ সাল থেকে নিজেকে হারাতে হারাতে যখন পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছিলাম, ২০১৬ সালে এসে নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রাণান্তর চেষ্টায় আবার নতুন করে শুরু করতে পেরেছি। নিজের চেষ্টার পাশা পাশি এককজন সুন্দর মনের সহজ সরল ভাল মানুষের সহযোগীতা ছিল উল্লেখ করার মত।

২০১৭ সালকে ঘিরে অনেকগুলো চিন্তাই করেছি। সেই চিন্তার কিছু ব্যক্তিগত আর কিছু সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার মত। এখানে কোন ব্যক্তিগত বিষয় আলোচনা করবো না। সবার সাথে ভাগ করে নেবার মত বিষয়গুলো উল্লেখ করবো যাতে করে আমার মাঝে যে চিন্তার উদ্রেগ হয়েছে তা আপনাদের মাঝেও হয়। আমি যেমন সমাজ, দেশ, আর পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করি ঠিক তেমনই আপনারাও চিন্তা করবেন সেটাও আশা করি। আপনাদের চিন্তার জগতে সামান্য আলোড়ন করার জন্যই বিষয়গুলো আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়া।

১। ইংরেজী চর্চা:

খুব ভাল ভাবে ইংরেজি চর্চা করা উচিত সেই উপলোব্ধিটা অনেক আগে থেকেই এসেছিল। এই উপমহাদেশে মুসলমানরা কেন পিছিয়ে আছে সেই ইতিহাস পড়তে গিয়ে যখন দেখেছি বৃটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মূলত উন্নতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আমাদের পূর্বজরা তখনই বুঝেছি ভুলটা এখনো আমরা ঠিক ভাবে শুধরে নিতে পারিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস যদি পড়েন তাহলে দেখবেন এটা গড়ে উঠার পেছনে যে আন্দোলন, যে উদ্দেশ্য তার পেছনেও ছিল এই পিছিয়ে পরা মুসলমানের এগিয়ে নিয়ে আসার প্রাণান্তর প্রচেষ্টা।

আধুনিক যুগে এসে ইংরেজি সবাই শিখতে চায় আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে। শেখার মূল আগ্রহ যোগাযোগকে সহজ করে নেবার জন্য। কিন্তু আমার কাছে ইংরেজির গুরুত্ব অন্য দিকে। এটা জ্ঞানের ভাষা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। আর আমি জ্ঞান বিজ্ঞানের সেই দরজায় করাঘাত করতে চাই। চাই জ্ঞানকে আমার ভাষায় নিয়ে আসতে। এজন্যই ইংরেজি আমার কাছে এতগুরুত্বপূর্ণ!

২০১৬ সালে ইংরেজির পড়ার উপর কিছুটা হলেটও দক্ষতা অর্জন করেছি। যখন বুঝতে পারলাম এখন আমি ইংরেজি পড়ে মজা পাচ্ছি তখন সত্যিই খুব ভাল লেগেছিল। গত বছর প্রচুর সম্পাদকীয় পড়া হয়েছে। সম্পাদকীয়গুলোর একটা মজা হল এটা ভবিষ্যতের একটা রূপরেখা অনুমান করে দেয় যা প্রায়সই বাস্তব হয়ে ধরা দেয়।

২০১৬ এর আগস্ট থেকে ইংলিশ শেখার সাইটগুলোতে বিদেশীদের সাথে চ্যাট করা শুরু করি। বেশ মজার পাবার সাথে সাথে বেশ চিন্তিতও করেছে এই চ্যাটিং অভিজ্ঞতা। খুব ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছে কেন ইংরেজি শেখা উচিত।

দুই একটা অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাচ্ছি বাস্তবতার উল্টো পিঠটা আমি যেমন বুঝতে পেরেছি ঠিক তেমনই যাতে আপনিও কিছুটা অনুধাবন করতে পারেন।

চ্যাটিং এ নিজের পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রেই প্রথমেই যে প্রশ্নটা করা হয় সেটা হল, “Where are you from?” খবু স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন। এর উত্তরও স্বাভাবিক, “I’m from Bangladesh.” কিন্তু এর পরের বিষয়গুলো আর স্বাভাবিক থাকে না। কেউ নিজে থেকেই বলে বসে, “তোমরা খুব গরীব দেশ, তাই না?” কেউ হয়তো বলল, “তোমাদের ওখানে মানুষ এখনো না খেয়ে মরে, ঐ দেশটা না?” প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পেতাম তাদের এমন নেতিবাচক কথায়। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের কথাগুলোর ধৈর্য ধরে জবাব দিবো। সত্যিই জবাব দিয়েছিলাম। জবাব দিয়ে খুব মজা পেয়েছি। কারণ অনেকের কাছেই নিজের দেশের একটা বাস্তাব চিত্র তুলে ধরেছি। মিথ্যা কিছু বলিনি। আমাদের দেশের দরীদ্র জনগোষ্ঠি যেমন আছে ঠিক তেমনই আমাদের গর্ব করার মত অনেক কিছু আছে। আমরা উন্নতি করছি। আমাদের সুন্দর বন আছে, কক্স বাজার আছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছি। এগুলো যখন বিস্তারিত তুলে ধরেছি তখন অনেকেই খুব অবাক হত। তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা জানতো তার বেশীর ভাগই ছিল নেতিবাচক। বাংলাদেশে অনেক দরীদ্র জনগোষ্ঠী, এখানে প্রচুর বন্যা হয় এবং মানুষ মারা যায়, এখানে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হয় নিয়মিত ইত্যাদি ইত্যাদি নানান নেতিবাচক কথাই শুধু তারা জানতো। এখনো মনে পড়ে প্রথম যে ব্যক্তিটা আমার বর্ণনা শুনে অবাক হয়েছিল সে ছিল ব্রাজিলের Luix। এখন আর তার সাথে কথা হয় না। কিন্তু সেই সময় দীর্ঘক্ষণ সে আমার কথা শুনেছে। এর পর আছে তুরস্কের Mata Hari। যতগুলো ধৈর্যশীল মানুষ পেয়েছি তার মধ্যে এ এক নম্বারে থাকবে। ইরানের Fatima। প্রচণ্ড চঞ্চল একটা মেয়ে। পিসি গেমের প্রতি প্রচন্ড রকমের নেশা। সৌদি আরবের Farah। মানুষটা প্রচণ্ড রকেমর ভুলের মধ্যে ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। এই মানুষগুলোর চোখ যখন খুলে দিতে পেরেছি তখন নিজের সামান্য ইংরেজি জ্ঞানটা স্বার্থক বলে মনে হয়েছে।

অনলাইনের অনেকগুলো বিরক্তিকর প্রশ্নের মুখমুখি হই। তার মধ্যে একটা হল যখন আমি বলি, “I’m from Bangladesh?” তখন অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন করে, “Is it from India” অথবা “Are you from India?” এই ধরণের প্রশ্ন করা মানুষগুলোর দেশ বিভিন্ন তাই বুঝে উঠতে পারি না এরা কি ইচ্ছে করে করে না সত্যিই বুঝে না। তাদের প্রত্যেককেই ধৈর্য ধরে উত্তর দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছি বাংলাদেশ একটা আলাদা দেশ।

সবাইকে বুঝাতে পেরেছি এমনটা হয়নি। কিছু কিছু মানুষকে বোঝানোটা একেবারেই অসম্ভব। যেমন Leonidus নামের এক ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলাকে বোঝাতে ব্যার্থ হয়েছি। সে তার এবং তার দেশ সম্পর্কে কখনোই আলোচনা করে না। তার বাংলাদেশের প্রতি একটা তীক্ষ্ণ বিতৃষ্ণা আছে। আর মুসলমানদের কথা উঠলে তো কোন কথাই নেই। একবার সে হঠাৎ করে আমাকে বলে বসল বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের পোড়ানো হয় এবং হিন্দুদের বেঁচে থাকার জন্য জিজিয়া কর দিতে হয়। আমি তার কাছে প্রমাণ চেয়ে বসলাম। সে কিছু লিংক দিল। প্রথম যে লিংকটা দিল জিজিয়া করের বিষয়টা বোঝানোর জন্য সেটা দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। সেখানে ব্যবহৃত প্রতিটি ছবি সত্য। অর্থাৎ বাংলাদের কোন না কোন সময় হিন্দু নির্যাতনের ছবিগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার উল্লেখ বা বিশ্লেষণ একেবারেই ভিন্ন। সেখানে ২০১৩ সালের একটি ঘটনার ছবি দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছিল এমন, “জিজিয়া কর দিতে রাজি না হওয়াতে বিএনপি-জামাক অ্যালায়েন্স হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুরিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা দেখে টাস্কি না খেয়ে পারলাম না। যে কেউ পড়লেই বুঝতে পারবে ফারাকটা কোথায়। তবে মজাটা অন্যখানে। যে সাইটার লিংক ছিল সেটি ভারত থেকে পরিচালিত এবং বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ হয় দেখে ভারত কেন এখনো হিন্দু সম্প্রদায়কে বাঁচাতে বাংলাদেশে দখন করে নিচ্ছে না তার জন্য আক্ষেপ করা হয়েছিল সেখানে। সাইটের স্লোগান ছিল, “২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট করা হবে”। (ইচ্ছে করেই সাইটের লিংকটা দিলাম না। আমি চাইনা আমার অজান্তেই তাদের প্রচারে সহযোগীতা করতে।) Leonidus কে বিস্তারিত বললাম। বুঝিয়ে দিলাম ফাঁক ফোকরগুলো। নিজে থেকেই স্বীকার করে নিলাম এই দেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করা হয়। কার করে, কেন করে সেগুলোও বুঝিয়ে দিলাম। সংখ্যাগুরুরাও একই ধরনের অনেক অত্যাচারের শিকার সেটাও বুঝিয়ে দিলাম। কিন্তু দিন শেষে বিচার না মেনে তাল গাছটা নিয়ে চলে গেল। তবে লাভের লাভ হয়েছিল অন্য যারা আমাদের আলোচনা শুনছিল তাদের মাঝে অনেকেই বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল।

মজার বিষয় হল গুলশান অ্যাটাকের পর আমি যতবারই নিজেকে বাংলাদেশী হিসেেব পরিচয় দিয়েছি ততবারই আমাকে শুনতে হয়েছে বাংলাদেশ এখন আইএসআইএস এর দখলে!!! মাস খানেক পর্যন্ত এটা নিয়ে অনেকের সাথেই তর্ক হয়েছে। বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত লেগেছে। কিন্তু থামিনি। বাংলাদেশের আইএসএর অবস্থানটা কোন পর্যায়ে আছে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছি।

প্রতিটা ক্ষেত্রেই খুব ভাল লেগেছে যখন নিজের যুক্তিগুলো তুলে ধরতে পেরেছি। প্রতিবারই বুঝতে পেরেছি বিশ্বে নিজেদের তুলে ধরতে হলে ইংরেজির গুরুত্বটা কতটা!

ইতিবাচক ভাবে দেখলে কি হয় আর নেতিবাচক ভাবে দেখলে কি রকম লাগে তা বুঝতে আপনারা নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন:

আমি EnglishClub.com এর Chat Room | EnglishClub  এ নিয়মিত বসি। এটাতে সাইনআপ না করেই চ্যাট করা যায় দেখে ভাল লাগে।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারগুলোর প্রতিবাদ করে যেমন মজা পেয়েছি ঠিক তেমনই ভাল লেগেছে সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, ফিলিস্তিনের মানুষগুরোর খবর তাদের কিংবা তাদের দ্বারা পরিচালিত গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনে। সাধারণ বিশ্বগণমাধ্যমে যে খবর আসেনা সে খবরগুলো বিস্তারিত তাদের মাধ্যমগুলো থেকে জানা যায়। যে খবর বিশ্বের খবর মাধ্যমগুলোতে আসে না তা আমাদের দেশের প্রচারমাধ্যমগুলোতে আসবে সেটা চিন্তা করাও অকল্পনীয়। ফিলিস্তিনের খবরগুলো জানার জন্য একটা ভাল মাধ্যম হল The Electronic Intifada পত্রিকা। আরেকটা পত্রিকা হল Palestine Chronicle। যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত ফিলিস্তিনিদের একটি আন্দোলন হল Palestine Solidarity Campaign তাদের ওয়েব থেকে আপনি জানতে পারবেন কিভাবে ইসরাইলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান মেনে নিতে কিছু সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে এবং কারা কারা তাদের সাথে একাত্ততা ঘোষণা করছে। এছাড়া ইসরাইলি পণ্য বয়কটের যে আন্দোলন বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে ইউরোপে জনপ্রিয় হচ্ছে তাদের একটা সাইট রয়েছে BDS Movement নামে।এদের ওয়েব সাইট থেকেও আমি ফিলিস্তিন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। এরা মূলত ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল কর্তৃক দখল করা এলাকায় উৎপাদিত পণ্য বয়কট করার জন্য আন্দোলন করে আসছে। এই বছর প্রথম চিনের অত্যাচারিত উইঘুর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলাম। এর আগে তাদের সম্পর্কে হালকা ধারণা ছিল যা অনেকটাই না থাকার মত। কিন্তু তাদের সংগঠন World Uyghur Congress এর ওয়েব সাইট পড়ে বাস্তব অবস্থা বোঝার পর বুঝতে পেরেছি বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমগুলো মুসলমানদের মানবাধিকার নিয়ে কতটা নিশ্চুপ থাকে। তাদের উপর কত উপায়ে কত জঘন্য রকমের অত্যাচার নিপিরণ চলছে তা সাইটে চোখ বুলালে সহজেই বুঝতে পারবেন।

অভিজ্ঞতাগুলো বর্ণনা করলাম যাতে করে আপনারা বুঝতে পারেন বিশ্বে বাংলাদেশ নিয়ে কি ধরনের ভয়াবহ অপপ্রচার চলছে। আমরা নিজেদর অনেক বড় করে চিন্তা করি। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু তার বিপরীতে পয়সার উল্টো পিঠের মত কি হচ্ছে সেটা জানা এবং প্রতিবাদ করাও আপনার আমার দায়িত্ব। তাছাড়া মুসলমানদের নিয়ে আমরা শুধু নেতিবাচক কথাই শুনি। আমরা সন্ত্রাসী, আমরা খুনী ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই কথাগুলোর পেছনের কথাগুলো কেউ বলে না, দীর্ঘ অত্যাচারের ইতিহাস কেউ তুলে ধরে না। আমার নিয়মিত BBC এর ইংরেজি সংস্করণ পড়া হয়। তাদের সাইটে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিন্দুদের নিপিড়নের খবর যতটা গুরুত্ব সহকারে এসেছে, এটা নিয়ে যতটা বিশ্লেষণ হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তার শতভাগের এক ভাগও হয়নি। বিবিসি বাংলাতে এই খবর বেশী এসেছে। কিন্তু বিসিসি বাংলা বাংলা ভাষাভাষী ছাড়া আর কারা পড়ে? নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমরা কোথায় আছি?

২০১৬ সালের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার ইংরেজি শেখার ইচ্ছাকে আরো সুদৃঢ় করেছে। ২০১৭ সালে সেই দৃঢ় ইচ্ছে শক্তির বাস্তবায়ন করবো। ২০১৬ সাল ছিল পড়া আর শোনার বছর। ২০১৭ সাল হবে ইংরেজি বলা এবং লিখার বছর। এখনো যেতে হবে বহুদূর। কিন্তু হাল ছেড়ে কচুরীপানার মত ভেসে যাবো না। নিজের এই জ্ঞানকে কাজে লাগাবো নিজের দেশের জন্য, নিজের জাতির জন্য, ইসলামের জন্য, মুসলমানেরদের জন্য। সকল ভ্রান্তিকে দূর করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

২। জ্ঞান চর্চা:

জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অনেক অনেক আগে থেকেই বুঝে আসছি। কিন্তু বুঝ পর্যন্ত। চেষ্টা করে নিজের জ্ঞানকে বৃদ্ধি করার কোন পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। ছোট বেলা থেকেই আমি একজন ভাল পাঠক। কিন্তু অগোছালো পাঠ ঠিক ভাবে নিজের জ্ঞানকে প্রস্ফুটিত করতে পারছিল না।

২০১৬ সালে তাই জ্ঞান চর্চার জন্য একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। সেটাকে এগিয়ে নিব ২০১৭ সালে।

জ্ঞান চর্চা কি কারণে দরকার তা নতুন করে কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ছোট্ট করে জ্ঞান চর্চার প্রতি আমার আগ্রহ নতুন করে জাগ্রত হবার কারণ উল্লেখ করতে চাচ্ছি।

সত্যি বলতে জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়েছে ইসলাম নিয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে। নিয়তই বুঝতে পারি আমি জানি, কিন্তু জানাটা সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারি না দেখে সত্যটা আর প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। এই জানা এবং না পারার মধ্যে পার্থক্য হল জানার জন্য জেনেছি, কিন্তু আত্মস্থ করার কিংবা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করিনি। তাই তথ্য আর জ্ঞান হয়ে উঠতে পারেনি।

এটি বুঝতে হলে একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে হবে। EnglishClub.com এ একবার Mary নামের একজন শিক্ষীকার সাথে মদীনা থেকে ইহুদীদের বের করে দেবার ঘটনা নিয়ে তর্ক হচ্ছিল Mustapha নামের আরেক শিক্ষকের। Mary বায়োলোজির শিক্ষক আর Mustapha একটি প্রতিষ্ঠাতে ফ্রেঞ্চ শেখায়। সেদিন তর্কে আমি অংশগ্রহণ করিনি। কারণ আমি ঘটনা জানি কিন্তু তথ্যসূত্র এবং নাম সহ উল্লেখ করার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার ছিল না। খুব কষ্ট লেগেছিল সেদিন। Mustapha কোন ভাবেই Mary কে ম্যানেজ করতে পারেনি। মদীনা থেকে মুহম্মদ (সাঃ) ইহুদীদের বিতারিত করেছিলেন কারণ তারা বার বার বিশ্বাস ঘাতকতা করছিল। শেষ পর্যন্ত একটি ইহুদী গোত্র যখন মুহম্মদ (সাঃ) কে বিষ পানে হত্যা করার চেষ্টা করে তখন আর তাদের ক্ষমা করা হয়নি। তাদের মদীনা থেকে বিতারিত করা হয়। অন্যান্য গোত্রগুলোও বার বার চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল দেখে তাদের বিতারিত করা হয়েছিল। যদি আমি সেদিন ঘটনাগুলো সাল, গোত্রের নাম, তাদের অবস্থানের এলাকা, তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বিবরণ, বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা, ইত্যাদি ধরে ধরে বলতে পারতাম তাহলে অবশ্যই Mary বুঝতে পারতো কি কারণে তাদের বিতারিত করা হয়েছে এবং সেটা অপরাধ হয়েছে কিনা। ব্যক্তিগত ভাবে Mary এর সাথে অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলে দেখেছি যুক্তি দিতে পারলে সে গ্রহণ করে। অন্যান্য ব্যক্তিদের মত সে তর্কের খাতিরে তর্ক করে না। ঘটনাটা ছোট্ট। কিন্তু আমাকে নারা দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল।

বাংলাদেশকে নিয়ে যখন চিন্তা করি তখনও বুঝি জ্ঞান চর্চা না করার কারণে বাংলাদেশকে নিয়ে আমার জানা সম্পূর্ণ না, কিংবা বাংলাদেশকে নিয়মিত জানার চিষ্টা করি না দেখে আমার দেশকে আমি ভাল করে বুঝে উঠতে পারি না। বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবার বিষয়ে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল গত বছরের অক্টোবরের দিকে। ইংরেজি লিখা চর্চা করার জন্য আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম আগে যেমন ঐতিহ্য চিন্তা করলে শ’খানেক এমনিতেই মাথায় আসতো, এখন এগুলো নিয়ে না ভাবার কারণে তিন-চারটার পর আর মনেই করতে পারছি না। যাও মনে পড়ছে সেগুলো খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল না! সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম জ্ঞান চর্চার ঘাটতি আমার সামান্য জ্ঞানটুকুকেও শেষ করে দিচ্ছে।

সামান্য জ্ঞানটুকু নিয়ে যখন আজকের প্রজন্মের কারো সাথে কথা বলি খুব অবাক হই। তারা আমার চাইতেও অনেক কম জানে। তারা ক্রুসেড সম্পর্কে জানে না। অথচ ক্রুসেড সম্পর্কে না জানলে বর্তমান “ইহুদী-খৃষ্টান বনাম মুসলমান” দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যাই করা যাবে না! ক্রুসেড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে অনেক তাবলীগ করা ছেলেদের কাছ থেকেই নেতিবাচক উত্তর পেয়েছি। অর্থাৎ তারা জানে না ‘ক্রুসেড’ কি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অনেকেই জানে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কি। কি কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সম্ভব হয়েছিল। এরা কি করে জাতির জন্য অবদান রাখতে পারবে তা আমার ছোট্ট মস্তিষ্কে ধরে না। সত্যিই আমি বুঝে উঠতে পারি না।

সব মিলিয়ে বুঝতে পেরেছি জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব শুধু বুঝলেই হবে না,  জ্ঞান চর্চা শুরুও করতে হবে। ২০১৭ সালকে এই জ্ঞান চর্চার ভিত্তির সাল হিসেবে স্মরণীয় করে রাখার ইচ্ছে আছে। আশা করি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে সেই তৌফিক দান করবেন।

৩। লিখালিখি :

এক সময় কিছুটা হলেও লিখালিখির অভ্যাস ছিল। টেকি প্রবন্ধ লেখা বেশী হলেও দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, ইসলাম নিয়ে, বিশেষ করে রাজনীতি নিয়েও বেশ ভালই লিখা হত। বিভিন্ন কারণে খুব দ্রুত লেখালেখির উপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে গেল।

কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আগ্রহটা ধরে রাখা উচিত ছিল। এতে করে নিজের যেমন ক্ষতি করছি তেমনই সমাজের জন্য বা অন্যের জন্য কিছু করার সুযোটাও নষ্ট করছি।

এই বছর ইচ্ছে আছে আবার লিখালিখি শুরু করবো। আগেও আমি কখনো যা খুশী তা লিখলাম না। লিখার একটা মান বজায় রাখার চেষ্টা করতাম। যদিও সেই সময় খুব বেশী গবেষণা করে বা পড়ালেখা করে লিখা হত না। কিন্তু এবার লিখালিখি শুরু করলে গবেষণা করে, পড়ে এবং সঠিক তথ্যসূত্র উপস্থাপন করে লেখার ইচ্ছে আছে। নিজেকে জানার জন্য লিখবো, দেশকে জানার জন্য লিখবো, সত্যকে উন্মোচিত করার জন্য লিখবো, লিখবো নতুন যে সংগ্রাম শুরু করতে যাচ্ছি তার ভিত্তি তৈরী করতে।

লিখার বিষয়টা জ্ঞানকে যেমন সমৃদ্ধ করে ঠিক তেমনই জ্ঞানের স্বল্পতাও ধরিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় কি কি এখনো জানা, বুঝা কিংবা উপলোব্ধি করা বাকী আছে। তাই লিখাটা আমার কাছে নিজেকে ‘পরীক্ষা’ তে ফেলার মতই। আশা করি নিয়মিত এই পরীক্ষা দিয়ে আমি আমাকে, আমার যোগ্যতাকে সমৃদ্ধ কতরে পারবো।

৪। দেশগঠনে কাজ করা:

কথাটা বলা যত সহজ করা তত সহজ না। কিন্তু চেষ্টা না করলে সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াও যায় না। স্বেচ্ছসেবী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করি অনেক আগে থেকেই। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে কোন না কোন সংগঠনের সাথে কাজ করে আসছি। এখনো অনেকগুলো সংগঠনের সাথে কাজ করছি।

কিন্তু কাজগুলো এখনো কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। করার জন্য করা কিংবা বলার জন্য করা। এই কাজগুলোতে মনোনিবেশ করার জন্য যে পরিমান সময় দেওয়া উচিত ছিল তা হয়ে উঠেনি।

দেশ পরিবর্তন করার জন্য সবার আগে যে স্থানটাতে কাজ করতে হবে সেটা হল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। কিন্তু এই ক্ষেত্রটাতে কাজ করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি দরকার যা মাঠে না নামলে বোঝা যায় না। চুড়ান্ত ভাবে মাঠে নামার আগে নিজের দক্ষতাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে ঝালাই করে নিতে হয়।

নিজেদের দক্ষতাগুলো ঝালাই করার একটা সুন্দর স্থান হতে পারে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করা। এখানে নেতৃত্ব দেওয়ার যেমন সুযোগ আছে, তেমনই জ্ঞানের পাত্রটাকে সমৃদ্ধ করারও সুযোগ আছে, গায়ে গতরে খাটার যেমন সুযোগ আছে, মেধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করারও সুযোগ আছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কথা আসলেই সবার আগে সমাজের জন্য, দেশের জন্য, অসহায় দরীদ্রদের জন্য কিছু করার কথা বলা হয়। বলা হয় না এগুলো নিজের জন্যও করা উচিত। এই সাধারন চিন্তার বাইরে আমি চিন্তা করি। আমার বিশ্বাস হল সমাজের জন্য, অসহায়দের জন্য কাজ করা মানে নিজের জন্য কাজ করা, নিজিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করা।

এ বছর ইচ্ছে আছে দেশের জন্য কাজ করার আগ্রহটাকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাবো। নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা করতে করতে মাঠ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি। ২০১২ সালে যে প্রচণ্ড গতিতে কাজ শুরু করেছিলাম তা ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ২০১৪ সাল থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছে।

কিন্তু হারাতে দিবো না। নিজের জন্য যেমন করবো, ঠিক তেমনই অন্যের জন্য করা থেকে কেউ বা কোন কিছুই আমাকে বিরত রাখতে পারবে না।


এমন অনেক কিছুই চিন্তা করেছি করার জন্য। কিন্তু পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হবে চিন্তা করে আর আগে বাড়ালাম না। আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ না যে আমার কথাগুলো আপনাদের অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়তে হবে কিংবা আমার চিন্তা জানার জন্য আপনাদের মাঝে প্রচণ্ড আগ্রহ আছে। তার পরও নিজের কথাগুলো সবার সাথে ভাগ করে নেবার পেছনে কাজ করেছে একজনও যদি উৎসাহিত হয়, সেই আশা। চার পাশে অনেক কিছু ঘটছে, বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু, তাই অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও বাড়ছে হুহু করে। সেগুলোর অনেকগুলোই গুরুত্বের দাবি রাখে, দাবি রাখে সেগুলো নিয়ে চিন্তা করার, আর চিন্তা দাবি রাখে কাজ করা।

আমি কাজ শুরু করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি, করছি। আসুন না! আপনিও এগিয়ে আসুন। হাতে হাত ধরে অসম্ভবকে সম্ভব করি!

Advertisements