আমুদে মানুষ হিসেবে জীবনের প্রতিটি সময় নানান মানুষের সাথে মিশে আনন্দে হাসিখুশীতেই কাটিয়েছি। কখনোই বন্ধুর কোন অভাব ছিল না। খেলার সাথি, সহপাঠীতো ছিলই, নানান ভাবে নানান বয়সের নানান জনের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে নানান উপায়ে। সবার সাথেই মিশেছি হৃদয় দিয়ে। তাই সবার সাথেই জীবনটাকে উপভোগ করেছি শতভাগ দিয়ে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তুলনায় খুব বেশী ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। এর প্রধান কারণ আমার পরিবার। এই পরিবারকে নিয়ে আমার গর্বের কোন সীমা নেই! এই পরিবারের জন্য আমি সব সময়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

পরিবারের পাশাপাশি যে বিষয়টার জন্য আমি সব সময়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি সেটা হল ‘বন্ধু’। সময় সময়ই আমার জীবনের চার পাশে অনেক মানুষ ছিল। তাদের মাঝে যাদের আমি বন্ধু বলি তাদের বাদ দিয়ে এই জীবনের উন্নতিকে আমি চিন্তাই করতে পারি না। তাদের প্রত্যেকের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ যারা আমার চারপাশে বন্ধুর মত থেকে আমাকে এগিয়ে এতদূর আসতে সহযোগীতা করেছে।

কিন্তু হঠাৎ করে এই ২০১৬ বছরটা আমার জন্য ‘একাকিত্বের‘ বছর হয়ে গেল। এক এক করে কাছের মানুষগুলো দূরে সরে গেল। সবাইকে হারিয়ে আমি এখন ‘অজানা পথের পথিক।’

ইমরান ভাইয়ের মৃত্যু:

২৬ অক্টোবর, ২০১৬ ছিল এই বছরের সবচাইতে বিস্ময়কর দিন, হৃদয় ভাঙ্গার দিন, স্বজন হারানোর দিন। এই দিন হঠাৎ করেই খবর এল ইমরান ভাই আর দুনিয়াতে নেই।

ইমরান ভাইয়ের সাথে অনলাইনে পরিচয় GNU/Linux ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমের সহযোগীতা দিতে গিয়ে ২০১০ সালের দিকে। এর পর ২০১২ সালে তার সাথে ১ম দেখা হয় একটি মিটিং করতে গিয়ে। নতুন প্রজন্ম, তরুণদের নিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবছিলাম অনেক আগে থেকেই। এই ভাবনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে অনেকেই বললেন আসেন বসি। অনলাইনে কথা বলে কাজ হবে না। বসার আহ্বান করেছিল প্রায় ৭৮ জন ব্যক্তি। অনুষ্ঠানে সর্বসাকুল্যে যোগ দিয়েছিল ১১ জন মানুষ। অনুষ্ঠান স্থলে যাওয়ার আগে হঠাৎ করে ইমরান ভাই কোন এক কারণে আমাকে ফোন করেছিলেন। আমি ফোন কথা বলতে বলতে তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলাম আজকে এমন একটা আয়োজন হচ্ছে আপনি আসবেন নাকি। তিনি এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন এবং এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে।

সেই থেকে তার সাথে শুরু। ৭৮ থেকে ১১ থেকে মাত্র আমরা দুইজন শেষ পর্যন্ত এক সাথে ছিলাম। সেদিন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, “উদিত তরুণ সমাজ বাংলাদেশ” নামে আমরা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলবো। সেই সংগঠন নিয়ে স্বপ্ন দেখার জন্য আমাকে সঙ্গ দিয়ে গিয়েছেন ইমরান ভাই। ২৪ তারিখেও তার সাথে কথা হয়েছিল উতসব নিয়ে। আর ২৬ তারিখে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার এই চলে যাওয়া আমাকে কতটা বিস্মিত করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।

ইমরান ভাইয়ের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস:-

তার একটা উক্তি খুব মনে পড়ে। একবার পথ শিশুদের জন্য কাপড় কিনতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমার মেয়ের জন্য আমি যেরকম কাড় কিনি তাদের জন্যও সেরকম কাপড় কিনবো। তাদের খারাপটা দিব কেন”? সেবছর আমরা প্রতিটি মেয়েকে যে কাপড় দিয়েছিলাম তার দাম ছিল ১৫০০ করে। ইমরান ভাই পথ শিশুদের জন্য এতটাই দিলখোলা মানুষ ছিলেন।

মানুষটার বাসায় হঠাৎ হঠাৎ চলে যেতাম। মন খারাপ হলেও আড্ডা দিতাম তার সাথে। কথা হত, গল্প হত, তর্ক হত, বিতর্ক হত, ফাজলামো হত। শুধু কখনো ঝগড়া হয়নি তার সাথে।

ইমরান ভাই! আপনি এই ভাবে না বলে, কোন ইশারা না করে একা ফেলে চলে গেলেন! আর কাকে ফোন করে ভাল্লাগেনা বলবো? কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবো সেফ হোমের? কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবো গরীবের জন্য হাসপাতাল বানানোর? আমরা সবাইতো নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত?

নজরুলের বিদেশ গমন:

২০১৬ সালটা একাকিত্বের বছর হিসেবে গণ্য হবার জন্য সম্ভবত এই একটা ঘটনা সবার উপরে থাকবে। ছোট বেলা থেকেই অনেক বন্ধু ছিল। তার মাঝে হাতে গোণা কয়েকজন ছিল ভাল বন্ধু, ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই হাতে গোণা কয়েকজনের মধ্যে দুই-তিনজন ছিল যাদের সাথে ছিল মনের সংযোগ! যাদের কাছে মন খুলে সব বলার মত ঘনিষ্ঠতা ছিল। এমন বন্ধুদের মধ্যে সর্বশেষ হিসেবে টিকে ছিল নজরুল। সবাই জীবেনর দৌড়ে এত ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে যে ডেকেও আর কাউকে পাওয়া যায় না। কিন্তু নজরুল ছিল ব্যতিক্রম। তাকে যখন খুশী তখন পেতাম। কমছে কম ফোন করে হলেও মনের দুঃখটা ভাগ করে নিতে পারতাম। ইচ্ছে হলে কান্নাকাটি করতে পারতাম।

নজরুলের সাথে আমার পরিচয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা একই বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করেছি। প্রথম দিকে আমি আইইআর এ নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আইইআর ছেড়ে দিব। ঠিক ঐ সময় যে মানুষটার কারণে নিজেকে সামলে নিয়ে আইইআরএ টিকে গিয়েছিলাম সে ছিল নজরুল। তাকে সব সময় বলতাম, “তুইতো আমার ভাই।”

বন্ধুদের মধ্য নজরুলের সাথেই আমার সবচাইতে বেশী বৈচিত্রময় স্মৃতি। এ কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

বন্ধুটি আমার আমায় একা করে বিবি সহ গত ২১ নভেম্বর, ২০১৬ আমেরিকায় পারি জমিয়েছে নতুন করে জীবন যুদ্ধ শুরু করার জন্য। তার নতুন জীবন যাত্রায় সে সঙ্গী হিসেবে একজনকে পেয়েছে, ওখানে গিয়ে আরো অনেককেই পাবে! কিন্তু আমাকে একাই জীবন যুদ্ধ চালানোর জন্য রেখে গেছে!

বন্ধু আমার! যেখানেই থাকিস, ভাল থাকিস! আর মনে রাখিস, অনেক দূর থেকে একটা মানুষ তোর জন্য অন্তরের অন্তরস্থল থেকে দোয়া করে যাচ্ছে।

পিচ্চিটার থেকে দূরে সরে গেলাম:

বন্ধুত্বের জন্য বয়স লাগে না। সেটা প্রমাণ করে তানজির সাথে অনেকটা বন্ধুর মতই হয়ে গিয়েছিলাম। খুব অল্প সময়ে আমার সম্পর্কে তাকে যতটা বলেছিলাম হয়তো আর কারো সাথেই এতটা বলা হয়নি। আমার অনেক বন্ধুও আমার সম্পর্কে এতটা জানে না।

তার সাথে প্রথম দেখা ৬ মার্চ, ২০১৪। সেই থেকে শুরু। অদ্ভুত একটা মানুষ! এই যুগে এতটা নরম আর ভাল মনের মানুষ পাওয়া খুব কঠিন। খুব দ্রুত মানুষ আপন করে নেবার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তানজির।

আদর করে তাকে “পিচ্চিমণী” বলে ডাকতাম। অনার্সে পড়লেও অনেক কিছুতেই তাকে মনে হত একটা পিচ্চি বাচ্চা! হয়তো তার সরলতাটা এমনই ছিল। সে যখন ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতো সেই ডাকটা সত্যিই প্রাণে আনন্দ সৃষ্টি করতো।

২০১২ সাল থেকে আমি মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে পড়তে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মত অবস্থায় চলে গিয়েছিলাম। আশে পাশে অনেকেই ছিল। কিন্তু আমাকে আরেকবার জাগিয়ে দেবার সুযোগ কেউ করে উঠতে পারেনি। নজরুল নিজেই মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়েছে। হঠাৎ করে জীবনে চলে আসা এই তানজিই তখন অনেকটা যেচে পড়ে আমাকে সাহস দিতে শুরু করে।

আমি সব সময়ই স্বীকার করতাম তাকে আমি যতটা আদর করেছি কোন ছোট মেয়ে আমার কাছ থেকে এতটা দূরে থাক, এর কাছাকাছি আদরও পায়নি। আমার অনেক ছোট ভাই ছিল, কিন্তু ছোট বোন একটাই, “তানজি।”

“খারাপ মানুষ”, আমি আমার পরিচয় দেবার ১ম দিনই তাকে এই কথাটা বলেছিলাম। কেন খারাপ মানুষ তার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলাম। মানুষটা সেটা বিশ্বাস করেনি।

সত্যিই আমি খারাপ মানুষ। তাই একজন ভাল মনের সরল মানুষকে কষ্ট দিতে মন চায় নি আর। তাই নিজেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি তার কাছ থেকে। তার আগমণের জন্য যেমন ২০১৪ সালটা চির স্মরণীয় হয়ে থাকে, ঠিক তেমনই তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবার কারণে ২০১৬ সালটা বিশেষ ভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মনে করবো আর কাঁদবো, “একজন ভাল মানুষকে কষ্ট দিয়েছি।”

পিচ্চিমণী! যেখানেই থেকো! ভাল থোকে! আর মনে রেখ ভাইয়া তোমাকে ঠিক আগের মতই ততটাই আদর করে। ততটাই ভাল বাসে!

রিং ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়া:

 বিপদ নাকি কখনো বলে কয়ে আসে না। ঠিক এই কথাই প্রমাণ করার জন্য রিং ভাইয়ের উপর আর বিপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে। জানিনা কখনো সেই বিপদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সে ফিরে আসতে পারবে কিনা?

এই বছরের মাঝামাঝি সময় এসে হঠাৎ করেই তিনি গায়েব হয়ে গেলেন। কয়েকদিন বুঝতেই পারিনি কি হচ্ছে। পরে অনুধাবন করতে পারলাম মানুষটা নিশ্চয় বিপদের মধ্যে আছে। যদিও বিপদের ধারণা করা সম্ভব হচ্ছিল না।

সাম্প্রতিক সময়ে যে মানুষটার সাথে সবচাইতে বেশী হাসি-ঠাট্টার সময় কাটিয়েছি সে সম্ভবত রিং ভাই! ভোজন রসিক মানুস হিসেবে আমার একটা ছোট্ট পরিচয় আছে। আর রিং ভাইয়ের সাথে তুলনা করলে আমি মোটেও তার কাছাকাছি যেতে পারবো না। তিনি যে কারও চাইতে বেশী ভোজন রসিক মানুষ। সম্ভবত এর জন্যই তার সাথে আমার সবচাই বেশী মিলত। এক সাথে খেতে বসে যখন আর পাঁচ-ছয় জন মানুষ হাত গুটিয়ে ফেলেছে, তখনো আমি আর রিং ভাই খাচ্ছি আর এর পরে কি নেওয়া যায় সেটা ভাবছি।

রিং ভাইয়ের সাথে মানসিক তেমন কোন সংযোগ ছিল না। আমার একান্ত ব্যক্তিগত কোন কিছু তার সাথে খুব একটা ভাগ করে নেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির পুরোটাই তিনি জানতেন। দুজনে মিলে লড়াই করছিলাম দুজনের পরিস্থিতিকে ভাল করতে।

হঠাৎ করে কোথা থেকে কি হয়ে গেল ‘নাটবল্টু’ নামক আমাদের সাজানো গোছানো সংসারটা ধ্বসে পড়ল। ২০১৬ সালটা স্বপ্ন ভঙ্গের বছর হিসেবেই থেকে যাবে।

রিং ভাই! আমার জন্য না হোক! এই সমাজের জন্য আপনাকে ফিরে আসতে হবে। ফিরে আসতে হবে অগণিত সেই মানুষগুলোর জন্য যাদের চোখ খুলে দেবার দায়িত্ব নিয়ে আপনি লড়াই করে গিয়েছেন। আমরা আপনার জন্য পথে চেয়ে থাকবো!

এই কয়জনই আসলে বলতে গেলের কাছের মানুষ ছিল। সবাই এক সাথে গায়েব হয়ে গেল একই এই জীবনটাকে টেনে নেবার জন্য।

এর বাইরে আরেকটা মানুষ এখনো আছে।

তাপসী:

কিন্তু সেও আসলে নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত আছে। নিজের জীবনের প্যাঁচগুলো খুলতে খুলতে দিন পার হয়ে যাচ্ছে। এর উপর নতুন চাকরী নিয়ে এখন তার কোন দিকে তাকানোর সময় নেই!

মেয়ে! আমার জীবন দিয়ে অনেক মানুষকেই আমি উদাহরণ দিয়েছি! লড়াই  করার অনুপ্ররণা দিয়েছি। তুমিই প্রথম কেউ যার কাছ থেকে আমি অনুপ্রেরণা নিয়েছি। যার জীবন আমাকে শিখিয়েছে শূণ্য থেকে কি করে শুরু করতে হয়। জানি তুমি হারবে না। সে বিশ্বাস আমার আছে। যেদিন তুমি জিতে যাবে, সেদিন তোমার সাথে অনেকেই জিতবে। অনেক অনেক দূর থেকে একটা মানুষ তোমার জয়ের আনন্দে চোখের পানি ফেলবে। সেটা খুশীর অশ্রু হবে শুধু এবং শুধু তোমার জন্য। হয়তো মানুষটা তোমার জন্য সেদিন কিছুই করতে পারবে না কিংবা কিছুই দিতে পারবে না, কিন্তু সেদিন তোমার জন্য, মনে রেখ, বিশ্বাস রেখ, সবচাইতে বেশী দোয়া করবে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে তার দোয়া কবুল করেছে দেখে।

দিন শেষে ২০১৬ সালে এসে সত্যিই একা হয়ে গিয়েছি। প্রথম কোন বছর, ২০১৭ শুরু করবো একাকিত্বের অভিশাপকে মাথায় রেখে। একই লড়বো। যে লড়াই শুরু করেছি নিজেকে প্রমাণ করার তাতে আমি কিছুতেই পরাজিত হব না। নিজেকে আমি প্রমাণ করবোই!

এটা আমার জীবন! আমি একে হেরে যেতে দিতে পারি না! ধৈর্যের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছি! জয় আমারই হবে! আমি তখন চিৎকার করে বলবো, “আমি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, কোন অক্ষম ব্যক্তি না!

Advertisements